দেশের স্বর্ণশিল্প বাজারে এসেছে স্বস্তির বার্তা। দীর্ঘদিন পর ভরিতে সোনার দাম কমলো ব্যাপক পরিমাণে। শনিবার সকালে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়, দেশের বাজারে সোনার দাম ভরিতে একবারে কমলো ৫ হাজার ৪৮২ টাকা। এই ঘোষণার ফলে ভালো মানের ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম এখন দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২৯ হাজার ৩৭৩ টাকায়। এর আগে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দাম ছিল দুই লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকা।
বাজুসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মূলত আন্তর্জাতিক বাজার ও তেজাবি সোনার দাম কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও এই দাম সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন দাম শনিবার সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে। দাম কমানোর এই সিদ্ধান্ত বাজুসের স্থায়ী মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ কমিটির বৈঠকে নেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন ক্যারেটের সোনার বর্তমান দাম
বাজুসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শুধু ২২ ক্যারেট নয়, বিভিন্ন ক্যারেটের সোনার দামও কমানো হয়েছে। নিচে বিভিন্ন ক্যারেটের সোনার বর্তমান দাম ও পরিবর্তন তুলে ধরা হলো:
| ক্যারেট / পদ্ধতি | পুরনো দাম (টাকা/ভরি) | নতুন দাম (টাকা/ভরি) | পরিবর্তন (টাকা) |
|---|---|---|---|
| ২২ ক্যারেট | ২,৩৪,৮৫৫ | ২,২৯,৩৭৩ | ৫,৪৮২ |
| ২১ ক্যারেট | ঘোষণা হয়নি | ২,১৮,৬৮৪ | ৫,১০৫ (আনুমানিক) |
| ১৮ ক্যারেট | ঘোষণা হয়নি | ১,৮৭,৬৭৪ | ৪,৩৭০ (আনুমানিক) |
| সনাতন পদ্ধতি | ঘোষণা হয়নি | ১,৫২,৮৫৭ | ৩,৬৩২ (আনুমানিক) |
বাজুস সূত্রে জানা গেছে, মূল্য নির্ধারণের এই নীতি সব জুয়েলারি শপের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। নতুন এই দামে একজন গ্রাহক আগের তুলনায় এক ভরি সোনা কিনতে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা সাশ্রয় করবেন।
২২ ক্যারেট সোনার দাম কমল কেন?
একজন বাজুস সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হলেও মাঝে মাঝে দাম কমে যায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের বিপরীতে সোনার মান ওঠানামা করলে বাংলাদেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে তেজাবি সোনার সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও চাহিদা কিছুটা কম থাকায় বাজুস দাম কমিয়ে বাজারকে সচল রাখার চেষ্টা করছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, মূল্যস্ফীতির এ সময়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে সোনা কেনা কষ্টকর। তাই দাম সমন্বয় করে বাজারকে সহনীয় করে তোলার জন্য জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সোনার দামের সাথে রুপার দামও কমানো হয়েছে
শুধু সোনা নয়, একই সঙ্গে রুপার দামও কিছুটা কমিয়েছে বাজুস। নিম্নে রুপার বর্তমান মূল্য তালিকা দেওয়া হলো:
- ২২ ক্যারেট রুপা: প্রতি ভরি ৫ হাজার ২৪৯ টাকা
- ২১ ক্যারেট রুপা: প্রতি ভরি ৪ হাজার ৯৫৭ টাকা
- ১৮ ক্যারেট রুপা: প্রতি ভরি ৪ হাজার ২৫৭ টাকা
- সনাতন পদ্ধতি রুপা: প্রতি ভরি ৩ হাজার ২০৮ টাকা
রুপার দাম কমায় গহনার বাজারে কিছুটা প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে যারা কম দামি গহনা পছন্দ করেন, তারা রুপার দাম শুনে খুশি হবেন।
কেনাকাটা করার সময় কী কী মাথায় রাখবেন?
একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী হিসাবে আমি দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের দেখছি। অনেক সময় তারা দাম কমলেই বেশি বেশি কেনার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখা ভালো:
- বাজুসের রেট চেক করুন: কেনার আগে যে কোনো জুয়েলারি শপে দাম বাজুসের ঘোষিত মূল্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
- হলমার্ক ও জুয়েলারির সঠিক তথ্য 확인: সোনার গহনায় হলমার্ক থাকলে তা পরীক্ষা করে নিন। এছাড়া কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিনছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
- দামের ওঠানামা জেনে নিন: সোনার দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রায়শই পরিবর্তন হয়। তাই কেনার আগে বাজারের খবর রাখা ভালো।
- ঋণ ও লোনের কথা মাথায় রাখুন: অনেক ক্ষেত্রে সোনার গহনার মূল্য ঋণের জামানত হিসেবে কাজ করে। তাই দাম কমলে জামানতের মানও কমতে পারে।
বাজুসের এই সিদ্ধান্ত ভোক্তাবান্ধব নাকি ব্যবসায়িক?
বাজুসের এই ঘোষণাকে অনেকেই ভোক্তাবান্ধব হিসেবে দেখছেন। কারণ মূল্যস্ফীতির সময়ে ভরিতে পাঁচ হাজার টাকা কমানো একটি বড় সিদ্ধান্ত। তবে একটি বড় অংশ মনে করছে, বাজুস শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দাম কমার কারণ দেখালেও স্থানীয় বাজারে চাহিদা কম থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সপ্তাহদুয়েক আগেও একজন গ্রাহক বলছিলেন, “সোনার দাম আকাশচুম্বী, বিয়ের সময় এখন সোনা নেওয়া কঠিন।” এখন দাম কমায় অন্তত যারা সংসার শুরু করবেন বা বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য সোনা কিনতে চান, তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
তবে দাম কমলেও এটি এখনো অনেকের নাগালের বাইরে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এ দাম এখনও বড় একটি বোঝা। বাজুসের উচিত আরও স্বচ্ছতা আনা এবং কীভাবে দাম নির্ধারণ করা হয়, তা জনসমক্ষে বলা।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
গত বছর এক বন্ধুকে বিয়ের জন্য সোনা কিনতে রাজধানীর একটি বড় জুয়েলারি শপে যেতে হয়েছিল। দাম শুনে তার প্রায় হতাশই হয়েছিলেন। তখন সোনার দাম ছিল দুই লাখ ত্রিশ হাজার টাকার ওপরে। এখন সেই দাম কিছুটা কমায় অবশ্যি স্বস্তি পাচ্ছেন অনেকে। তবে দাম কমানোর পরও তিনি বলেছেন, “এখনো অনেক টাকা লাগে, তবে আগের চেয়ে কিছুটা সহজ হয়েছে।”
সব মিলিয়ে সোনার দাম ভরিতে একবারে কমলো ৫ হাজার ৪৮২ টাকা, এটি বাজারের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু যারা সোনা কিনবেন, তাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং বাজুসের অফিসিয়াল মূল্য যাচাই করে তবেই কেনাকাটা করা উচিত।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
সোনার দাম ভরিতে একবারে কমলো ৫ হাজার ৪৮২ টাকা বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) শনিবার সকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ৫ হাজার ৪৮২ টাকা কমানো হয়েছে। অর্থাৎ আগের দাম দুই লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকা থেকে কমিয়ে বর্তমানে দুই লাখ ২৯ হাজার ৩৭৩ টাকা করা হয়েছে।
কেন সোনার দাম কমলো?
আন্তর্জাতিক বাজারে তেজাবি (পিওর গোল্ড) সোনার দাম কমে যাওয়ায় এবং স্থানীয় বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার সমন্বয় করার জন্যই এই দাম কমানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস।
বাজুসের ঘোষিত দাম কি সব জুয়েলারি শপে সমান প্রযোজ্য?
হ্যাঁ, বাজুসের নিয়ম অনুযায়ী সারা দেশের সব জুয়েলারি শপে এই দাম সমানভাবে প্রযোজ্য। তবে কোনো দোকান নিজস্ব সেবা চার্জ বা অতিরিক্ত কিছু নিলে দাম কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তাই কেনার আগে বাজুসের রেট চেক করে নেওয়া ভালো।
২২ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট ও সনাতন সোনার বর্তমান দাম কত?
বাজুসের নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের ভরি ২ লাখ ২৯ হাজার ৩৭৩ টাকা, ২১ ক্যারেটের ভরি ২ লাখ ১৮ হাজার ৬৮৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ভরি ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির ভরি ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সোনার দাম কমায় আমার পুরাতন গহনার মান বা দাম কি কমে যাবে?
হ্যাঁ, বাজারে সোনার দাম কমলে পুরাতন গহনার মূল্যও কিছুটা কমতে পারে। তবে এটি নির্ভর করে আপনি বর্তমান বাজারদরে তা বিক্রি করছেন নাকি অদলবদল করছেন তার ওপরে। সাধারণত দাম কমলে পুরাতন সোনার ভাঙানি দামও কিছুটা কমে যায়।
এই দাম কমানো কি স্থায়ী হবে নাকি আবার বাড়তে পারে?
সোনার দাম স্থিতিশীল নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর ভিত্তি করে এটি প্রায়শই ওঠানামা করে। বাজুস প্রতিনিয়ত বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দাম সমন্বয় করে। তাই দাম আগামী দিনে বাড়তে বা কমতে পারে।

