বাংলাদেশের ইতিহাসে সোনার দামের অস্থিরতা এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারী সবার চোখ এখন জুয়েলারি দোকানগুলোর সাইনবোর্ডের দিকে। সোমবার সকালে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) যখন নতুন দামের ঘোষণা দিল তখন দেখা গেল সোনার দাম আবারো এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে।
দেশের বাজারে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম এখন দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ১০৪ টাকায়। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ভরিতে বেড়েছে ৫ হাজার ৪২৪ টাকা। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই উর্ধ্বগতি টানা তিন দিন ধরে চলছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই দাম বৃদ্ধির ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক দিন ধরেই সোনার বাজার অত্যন্ত অস্থিতিশীল। গত শনিবারই দুই দফায় দাম বাড়ানো হয়েছিল, যার দ্বিতীয় দফার বৃদ্ধি কার্যকর হয়েছিল গত রবিবার থেকে।
কেন বাড়ছে সোনার দাম?
বাজুসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় তেজাবি বাজারে (পিওর গোল্ড) কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা এই নতুন মূল্য নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে। তবে বাজার বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন যে, এর মূল কারণ লুকিয়ে আছে বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির মধ্যে। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে সোনার দামের এক তীব্র উর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম এখন ৫ হাজার ৩৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। গত কয়েক দিনেই আউন্সপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ডলার।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ছে। গত এক মাসের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা জটিল। গত ৩০ দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৬০০ ডলারের বেশি। আর গত ছয় মাসের হিসাব করলে এই বৃদ্ধির পরিমাণ ১ হাজার ৭০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মূলত গত বছর থেকেই বিশ্বজুড়ে সোনার দামের এই উর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
আজকের সোনার বাজার দর (প্রতি ভরি):
- ২২ ক্যারেট: ২,৭৪,১০৪ টাকা
- ২১ ক্যারেট: ২,৬১,৬৮২ টাকা
- ১৮ ক্যারেট: ২,২৪,২৯৯ টাকা
- সনাতন পদ্ধতি: ১,৮৩,৫৩৩ টাকা
- ২২ ক্যারেট রুপা: ৭,১৭৩ টাকা
*বিক্রয় মূল্যের সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং গ্রামপ্রতি ৩০০-৫০০ টাকা মেকিং চার্জ প্রযোজ্য।
বিশ্ব পরিস্থিতি ও সোনার নিরাপদ বিনিয়োগ
বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমান অনিশ্চয়তা সোনার দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা থেকে বাঁচতে পৃথিবীর অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন তাদের রিজার্ভে সোনার পরিমাণ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে চীন, ভারত এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলো ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সোনায় বিনিয়োগ করছে। এছাড়া বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সোনাকে বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে ‘নিরাপদ সম্পদ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকেই দেশের সোনার বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। গত ২৯ জানুয়ারি সোনার দাম এক লাফে ১৬ হাজার টাকার বেশি বেড়েছিল এবং তখন প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, যা ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্ববাজারে ডলারের দুর্বলতা এবং সুদের হার কমার সম্ভাবনা থাকায় সোনার দামের এই সমর্থন বজায় থাকতে পারে।
ক্রেতাদের জন্য সতর্কতা ও পরামর্শ
এমন অস্থিতিশীল বাজারে সোনা কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের বিশেষ সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজুসের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দাবি করেন। তাই সোনা কেনার আগে অবশ্যই বাজুসের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নেওয়া উচিত। এছাড়া সোনা কেনার সময় অবশ্যই ‘হলমার্ক’ দেখে কেনা উচিত। হলমার্ক করা সোনা বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা দেয় এবং পরবর্তীতে বিক্রি করতে গেলে সঠিক দাম পাওয়া যায়।
বিয়ে বা উৎসবের মৌসুমে সোনার চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে, যা দামের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করে। যারা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সোনা কিনতে চান, তাদের জন্য গহনার চেয়ে সোনার বার বা কয়েন কেনা বেশি লাভজনক হতে পারে। কারণ গহনায় মেকিং চার্জ অনেক বেশি থাকে, যা বিক্রির সময় ফেরত পাওয়া যায় না।

