বর্তমান যুগে ফ্যাশন এবং রুচির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গয়না পরার প্রবণতা নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই দেখা যায়। তবে মুসলিম সমাজে পুরুষদের জন্য স্বর্ণ পরার বিষয়টি নিয়ে অনেক সময় দ্বিধা বা কৌতূহল তৈরি হয়। অনেকে জানতে চান, ইসলামে ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পড়তে পারবে বা আদৌ কোনো পরিমাণ স্বর্ণ পরা বৈধ কি না। একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ধর্মীয় বিধান মেনে চলা জরুরি। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহারের সঠিক নিয়ম, হাদিসের ব্যাখ্যা এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে।
ইসলামে পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহারের বিধান
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যেখানে নারী এবং পুরুষের পোশাক ও অলঙ্কারের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরাসরি উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী পুরুষদের জন্য স্বর্ণ বা সোনার অলঙ্কার ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ। এটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণের জন্য নয়, বরং সামান্য পরিমাণ স্বর্ণ ব্যবহার করাও পুরুষদের জন্য বৈধ নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিস থেকে এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, স্বর্ণ এবং রেশমি কাপড় আল্লাহ তাআলা উম্মতের নারীদের জন্য হালাল করেছেন এবং পুরুষদের জন্য তা হারাম করেছেন। তাই কোনো পুরুষ যদি শখ করে বা আভিজাত্য প্রকাশ করতে গিয়ে সোনার আংটি, চেইন বা অন্য কোনো অলঙ্কার পরেন, তবে তা গুনাহের কাজ হিসেবে গণ্য হবে।
ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পড়তে পারবে: হাদিসের নির্দেশনা
হাদিস শরিফে এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর এবং স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, একদিন আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর এক হাতে রেশম নিলেন এবং অন্য হাতে স্বর্ণ নিলেন। অতঃপর বললেন, “নিশ্চয়ই এই দুটি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং নারীদের জন্য হালাল।” (সুনানে আবু দাউদ)।
অন্য একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির হাতে একটি সোনার আংটি দেখতে পেলেন। তিনি সেটি তাঁর হাত থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং বললেন, “তোমাদের কেউ কি আগুনের জ্বলন্ত কয়লা নিজ হাতে রাখতে পছন্দ করবে?” লোকটিকে পরে বলা হয়েছিল আংটিটি তুলে নিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করতে (যেমন বিক্রি করে দেওয়া), কিন্তু তিনি তা করতে অস্বীকার করেন কারণ আল্লাহর রাসূল (সা.) এটি ছুঁড়ে ফেলেছেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পড়তে পারবে এই প্রশ্নের উত্তর হলো ‘একবিন্দুও নয়’।
আরও জানতে পারেনঃ ছেলেদের রুপা পরা কি জায়েজ ও সুন্নাহর নির্দেশনা
পুরুষের জন্য রূপার ব্যবহার কি বৈধ?
স্বর্ণ নিষিদ্ধ হলেও পুরুষদের জন্য রূপার অলঙ্কার ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে তারও একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, একজন পুরুষ প্রয়োজনে একটি রূপার আংটি পরতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে একটি রূপার আংটি ব্যবহার করতেন, যা তাঁর মোহর বা সিল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
তবে রূপার আংটি পরার ক্ষেত্রেও আভিজাত্য বা অহংকার পরিহার করা উচিত। সাধারণত সাড়ে চার মাশা বা ৪.৩৭ গ্রাম ওজনের কম ওজনের একটি রূপার আংটি পরা পুরুষদের জন্য জায়েজ বলে ফুকাহায়ে কেরাম মত দিয়েছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, রূপার চেইন বা ব্রেসলেট পরা পুরুষদের জন্য অনুচিত, কারণ এটি নারীর বেশভূষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়, যা ইসলামে অপছন্দনীয়।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে স্বর্ণ ব্যবহারের নিয়ম
ইসলামি শরিয়তে বিশেষ প্রয়োজনে বা নিরুপায় অবস্থায় কিছু শিথিলতা রয়েছে। চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজনে যদি স্বর্ণ ব্যবহার ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প না থাকে, তবে তা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কারো দাঁত নষ্ট হয়ে যায় এবং চিকিৎসকের পরামর্শে স্বর্ণের দাঁত লাগানো জরুরি হয়, তবে তা জায়েজ হতে পারে।
ইতিহাসে বর্ণিত আছে, আরফাজা ইবনে আসআদ (রা.) নামক এক সাহাবীর নাক একটি যুদ্ধে জখম হয়েছিল। তিনি রূপার একটি নাক তৈরি করে লাগিয়েছিলেন, কিন্তু তাতে দুর্গন্ধ দেখা দেয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে স্বর্ণের নাক বানিয়ে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুতরাং, চিকিৎসা বা অঙ্গহানি রোধে বিকল্প না থাকলে স্বর্ণ ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তা সাধারণ অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেয় না।
কেন পুরুষদের জন্য স্বর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন শুধুমাত্র পুরুষদের জন্যই স্বর্ণ নিষিদ্ধ? ইসলামের প্রতিটি বিধানের পেছনেই কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত থাকে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে, পুরুষের জন্য বীরত্ব এবং চারিত্রিক কাঠিন্য বেশি জরুরি। স্বর্ণালঙ্কার সাধারণত কোমলতা এবং নারীত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। পুরুষরা যাতে নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ না করে, সেজন্যই এই নিষেধাজ্ঞা।
এছাড়া আধুনিক বিজ্ঞানও কিছু ক্ষেত্রে বলছে যে, স্বর্ণের কণা ত্বকের মাধ্যমে পুরুষ দেহে প্রবেশ করলে তা হরমোনের ভারসাম্য এবং প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও ইসলামি বিধান পালনের জন্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের প্রয়োজন নেই, তবুও এই বিষয়গুলো নির্দেশ করে যে আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তই মানুষের জন্য কল্যাণকর।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
বিয়ের সময় কি ছেলেরা স্বর্ণের আংটি পরতে পারবে?
না, বিয়ের অনুষ্ঠান হলেও ছেলেদের জন্য স্বর্ণের আংটি পরা জায়েজ নেই। বিয়ের মতো পবিত্র কাজে হারাম কোনো কাজ দিয়ে শুরু করা অনুচিত। এক্ষেত্রে রূপার আংটি বেছে নেওয়া যেতে পারে।
সামান্য পরিমাণ স্বর্ণ থাকলে কি দোষের হবে?
হ্যাঁ, অলঙ্কার হিসেবে স্বর্ণের পরিমাণ যত কমই হোক না কেন, তা পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ।
হোয়াইট গোল্ড কি পুরুষরা পরতে পারবে?
হোয়াইট গোল্ড বা সাদা স্বর্ণ মূলত স্বর্ণেরই একটি রূপ। এর মূল উপাদান স্বর্ণ হওয়ায় এটিও পুরুষদের জন্য হারাম।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পড়তে পারবে এই বিষয়ে ইসলামের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কঠোর এবং পরিষ্কার। স্বর্ণ পরার অভ্যাস পুরুষত্বের আভিজাত্য নয়, বরং ধর্মীয় বিধান অমান্য করার নামান্তর। ইহকালে সামান্য সুন্দরের লোভে পরকালের চিরস্থায়ী শান্তি হারানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই আমাদের উচিত ফ্যাশনের নামে ধর্মীয় সীমা অতিক্রম না করা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে জীবন পরিচালনা করা। আমাদের এই আলোচনাটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে এবং তথ্যবহুল মনে হয়, তবে অন্যদের সাথে শেয়ার করে সঠিক বিধান জানতে সাহায্য করুন। আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন।

