দেশের বাজারে ফের রেকর্ড ছোঁয়া সোনার দাম ভরিতে ১,০৫০ টাকা

বাংলাদেশের সোনার বাজার যেন থামছেই না। একের পর এক রেকর্ড ভেঙে চলেছে দামের পারদ। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) সকাল থেকেই ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা কিনতে গেলে পকেট থেকে বের করতে হবে ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৫ টাকা। এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সোনার সর্বকালের সর্বোচ্চ দাম।

বৃহস্পতিবার রাতে বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য তদারকি স্থায়ী কমিটির সভা শেষে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, স্থানীয় বাজারে সোনার মূল্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য এই সমন্বয় করা হয়েছে। মাত্র এক লাফে ভরিতে ১ হাজার ৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ২২ ক্যারেটের সোনা।

নতুন দামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা (১২ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর)

  • ২২ ক্যারেট (হলমার্কড): ২,১২,১৪৫ টাকা (+১,০৫০ টাকা)
  • ২১ ক্যারেট: ২,০২,৪৯৯ টাকা
  • ১৮ ক্যারেট: ১,৭৩,৫৭২ টাকা
  • সনাতন পদ্ধতির সোনা: ১,৪৪,৪২৪ টাকা

বাজুস স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, উপরের দামের সঙ্গে যোগ হবে সরকার-নির্ধারিত ৫% ভ্যাট এবং বাজুসের নির্ধারিত ন্যূনতম ৬% মজুরি। ফলে এক ভরি ২২ ক্যারেটের সাধারণ ডিজাইনের গহনা কিনতে আসল খরচ পড়বে প্রায় ২ লাখ ৩৪-২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। আর জটিল কারুকাজ বা ডায়মন্ড সেটিং করা গহনা হলে খরচ সহজেই আড়াই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

২০২৫ সালে ৮৪তম সমন্বয়: বাড়ার ধারাই প্রবল

চলতি বছরে এ নিয়ে ৮৪ বার সোনার দামে হাত দেওয়া হলো। যার মধ্যে:

  • দাম বেড়েছে ৫৭ বার
  • দাম কমেছে মাত্র ২৭ বার
See also  সোনার দাম ফের বাড়ল,জানুন ভরি অনুযায়ী নতুন দাম

অর্থাৎ প্রতি তিনটি সমন্বয়ের মধ্যে দুটিতেই ক্রেতাদের পকেটে চাপ পড়েছে। গত বছর ২০২৪ সালে মোট ৬২ বার সমন্বয় হয়েছিল। যেখানে ৩৫ বার বেড়েছিল এবং ২৭ বার কমেছিল দাম। এবারের পরিসংখ্যান দেখে স্পষ্ট ২০২৫ সালে সোনার দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে।

রুপোর দাম অপরিবর্তিত, তবে বেড়েছে বছরজুড়ে

সোনার দাম বাড়লেও রুপার বাজারে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বর্তমান দাম:

  • ২২ ক্যারেট রুপা: ৪,২৪৬ টাকা
  • ২১ ক্যারেট: ৪,০৪৭ টাকা
  • ১৮ ক্যারেট: ৩,৪৭৬ টাকা
  • সনাতন পদ্ধতি: ২,৬০১ টাকা

তবে চলতি বছরে রুপার দামও শান্ত ছিল না। এ পর্যন্ত ৯ বার সমন্বয় হয়েছে এর মধ্যে ৬ বার বেড়েছে, কমেছে মাত্র ৩ বার। গত বছর মাত্র ৩ বার সমন্বয় হয়েছিল রুপার।

কেন এত দ্রুত বাড়ছে দাম?

বাজুসের ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রতি ট্রয় আউন্স ২,৭০০ ডলারের কাছাকাছি ঘুরছে যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। এছাড়া:

  • ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যহ্রাস (বর্তমানে ১২৪-১২৫ টাকা প্রতি ডলার)
  • আমদানি শুল্ক ও এলসি খরচ বৃদ্ধি
  • বিশ্ববাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বড় অংকের সোনা কেনা
  • ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও মুদ্রাস্ফীতির ভয়ে বিনিয়োগকারীদের ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে সোনার চাহিদা বৃদ্ধি

এসব কারণে দাম কমার কোনো সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন তারা।

বিয়ের মৌসুমে ক্রেতাদের হতাশা

ডিসেম্বর-জানুয়ারি বাংলাদেশের বিয়ের প্রধান মৌসুম। কিন্তু টানা দাম বৃদ্ধিতে অনেক পরিবারই এখন গহনার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে বা রুপো ও সিটি গোল্ড গহনার দিকে ঝুঁকছে। রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি, নিউমার্কেট ও বায়তুল মোকাররমের দোকানগুলোতে গতকাল সন্ধ্যা থেকেই ক্রেতার সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। অনেকে শুধু দাম জেনে মুষড়ে ফিরে গেছেন। এক ক্রেতা জানান, “আমার মেয়ের বিয়ের জন্য ১০ ভরি সোনা কিনব ভেবেছিলাম। এখন ৫ ভরিও কিনতে পার সাহস হচ্ছে না।”

See also  কলকাতায় টানা দরপতনের পর সোনা, রুপোর দাম নিয়ে খারাপ খবর

আরও জানতে পারেনঃ ভারতে কালকের পর ফের পতন সোনার দামে

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য

বাজুসের সাবেক সভাপতি এনামুল হক খান বলেন, “আমরা চাই না দাম বাড়ুক। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার ও ডলারের দামের কাছে আমরাও অসহায়। আমদানি করা সোনার খরচ বেড়ে যাচ্ছে প্রতি সপ্তাহে। লোকসান দিয়ে বেচতে পারি না।”

আগামী দিনে কী হবে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, যতদিন না ডলারের দাম ১১১৫ টাকার নিচে নামছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ২,৫০০ ডলারের নিচে নামছে ততদিন সোনার দেশের বাজারে সোনার দাম কমার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং আরও কয়েক দফা বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। সোনার এই ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের সঞ্চয়, বিয়ের বাজেট ও বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। যারা এখনও সোনা কিনতে চান তাদের জন্য এটি সত্যিই এক কঠিন সময়।

Leave a Comment